মোটরসাইকেলের কিছু টেকনিক্যাল শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্য যেগুলো আপনার জানা জরুরী

আসলে আপনারা যারা বাইক সম্পার্কে আগ্রহী তারা বিভিন্ন সাইটে বা ম্যাগাজিনে বিভিন্ন বাইকের বিভিন্ন রিভিউ দেখে থাকবেন । এইসব রিভিউতে অনেক শব্দ ব্যাবহার করা হয় যেগুলোর অনেক শব্দই হয়ত আপনি জানেন না বা এর অর্থ ভালভাবে বুঝতে পারে না । আপনি যদি বাইকের এইসব টেকনিক্যাল শব্দগুলো অর্ না বুঝতে পারেন তাহলে আপনাকে একজন ভুল রাইডার হিসেবে ধরা যায় না । কারণ , এইগুলে এমন সব শব্দ যেগুলোর অর্থ না জানলে আপনি আপনার বাইক সম্পর্কে ভালভাবে বুঝতে পারবেন না ।

মোটরসাইকেলের কিছু টেকনিক্যাল শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্য যেগুলো আপনার জানা জরুরী

অবশ্য এইসব শব্দার্থ নিয়ে লিখতে গেলে একটা বড়সড় বই ও লিখে ফেলা যায় । কিন্তু আজ আমি আপনাদের সামনে আমার নিজের বাষায় এবং সহজ করে এই শব্দগুলোর অর্থ তুলে ধরব । এই শব্দগুলো বাইকের স্পেসিফিকেশনের সাথে অত্যান্ত গভীরভাবে জড়িত । তো আসুন , আজ আমরা বাইকের কিছু অপরিচিত টেকনিক্যাল শব্দের সাথে পরিচিত হই ।

স্ট্রোক নম্বর :

এটা ইন্জিনের পুরো কাজকর্মের সাথে জড়িত একটা শব্দ । আমরা এখানে ৪-স্ট্রোক ইন্জিন সম্পর্কে আলোচনা করব । তবে কখনও ফোর স্ট্রোক ইনিজনের সাথে ৪ সিলিন্ডার ইন্জিনের কোন মিল খুজতে যাবেন না । কারণ জিনিস ২ টা সম্পূর্ণ আলাদা । এখন আসুন আমরা দেখে নিই একটা ৪-স্ট্রোক ইন্জিন কীভাবে কাজ করে ।

স্ট্রোক ১: ইনটেক ভালব খুল যায় ও পিষ্টন নীচের দিকে নেমে যায় । এই সময় জ্বালানী ও বায়ুর মিশ্যণ ইন্জিনের দহনকক্ষে প্রবেশ করে ।

স্ট্রোক ২ : সব ভালব বন্ধ হয়ে যায় এবং পিষ্ট নিচের দিকে নেমে গিয়ে এই জ্বালানী মিশ্রণকে প্রচণ্ডভাবে চাপ দেয় ।

স্ট্রোক ৩: সব ভালব বন্ধ থাকে এবং পিষ্টন নীচের দিকে প্রেশারে থাকে । এই সময় স্পার্ক প্লাগ থেকে জ্বালানী মিশ্রণে অগ্নিসংযোগ করা হয় ।

স্ট্রোক ৪: জ্বালানী মিশ্রেণ প্রচন্ড বিষ্ফোরণের ফলে পিষ্টণ উপরের দিকে উঠে যায় এবং এইসময় এক্সহাউস্ট ভালবগুলো শুধু খোলা থাকে ।

এরপর আবার প্রথম থেকে সব প্রসেস শুরু হয় ।

কুলিং :

কুলিং হল ইন্জিনকে ঠান্ডা রাখার একটা প্রক্রিয়া । যেকোন ইন্জিন সাধারণত গরম হয় । তাই সব যানবাহনের ইন্জিনে কুলিং সিস্টেম থাকে । বাইক মূলত ২ধরণের কুলিং সিস্টেম রয়েছে । এয়ার কুলিং ও লিকুইড কুলিং । এয়ার কুলিং হল বাইক চলার সময় যে বাতাস আসে সেটা বাইকের ইন্জিনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করে বাইকের ইন্জিনকে ঠান্ডা রাখা । আর লিকুইড কুলিং হল বাইকের ইন্জিনের ভেতর একপ্রকার লুব্রিকেন্ট দ্বারা ইন্জিনের উৎপন্ন সব তাপ বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া । অবশ্য লিকুইড কুলিং এ লিকুইড ও এয়ার কুলিং মেথড একসাথে ব্যাবহার করা হয় ।

 

সিলিন্ডার নম্বর :

বাইকে সাধারণত একটা থেকে ৬ টা সিলিন্ডার থাকতে পারে । সাধারণত ছোট বাইকগুলোতে ১ সিলিন্ডার বিশিষ্ঠ ইন্জিন ব্যাবহার করা হয় । আর বড় বাইক গুলোতে ডবল সিলিন্ডারের ইন্জিন ব্যাবহার করা হয় । এই ডবল সিলিন্ডারের ইন্জিনগুলো আবার বিভিন্ন নামে বিশেষায়িত । যেমন :

V টুইন ইন্জিন : এই টাইপের ইন্জিনে ২ টা সিলিন্ডার V এর মত করে পাশাপাশি বসানো থাকে ।

প্যারালাল টুইন : এই ধরণের ইন্জিনগুলোতে ২ টা সিলিন্ডার পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে থাকে ।

ফ্লাট টুইন : এই ধরণের ইন্জিনে ২ টা সিলিন্ডার পরস্পরের বিপরতি দিকে বসানো থাকে যেমনটা থাকে বিএমডব্লিউ বক্সারে ।

এছাড়াও অনেক ইন্জিন আছে যেগুলোতে ২ টা বেশী সিলিন্ডার থাকে । যেমন এগুলোকে বলা হয় ট্রিপল , ইনলাইন ফোর , V-4 ইন্জিন , V-6 ইন্জিন এবং ফ্লাট-6 ইন্জিন ।

ডিসপ্লেসমেন্ট :

একটা ইন্জিনের পিষ্টন ইন্জিনের একদম শেষ প্রান্ত থেকে উপরের প্রন্ত পর্যন্ত যে পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে সেই স্থানের আয়তন কে বলা হয় ডিসপ্লেসমেন্ট এবং এটা কিউবিক সেন্টিমিটার অথবা কিউবিক ইন্চিতে সাধারণত লেখা হয় । আমরা সাধারণত বাংলাদেশে সিসি বা কিউবিক সোন্টমিটারেই ডিসপ্লেসমেন্ট পরিমাপ করে থাকি।

বোর এবং স্ট্রোক :

একটা ইন্জিনের সিলিন্ডারের ভেতর পিষ্টনের ওঠানামা করা জন্য যেটুকু ব্যাস থাকে তাকে বোর বলা হয় । মোট কথা , কোন ইন্জিনের সিলিন্ডারের ব্যাসকেউ বোর বলে । আর সিলিন্ডারের ভেতর যে উচ্চতাটুকু পিষ্টন ওঠানামা করতে পারে তাকে স্ট্রোক বলে।

ফুয়েল সিস্টেম :

একটা বাইকের ইন্জিনে যেভাবে জ্বালানী মিশ্রণের প্রবাহ কন্ট্রোল করা হয় সেই সিস্টেমকে বাইকের ইন্জিনের ফুয়েল সিস্টেম বলে । এটা সাধারণত ২ রকম হয় । কার্বুরেটর ও ফুয়েল ইনজেকশন । ইন্জিনের দহনকক্ষে জ্বালানী মিশ্রণ ঢোকার সময় এটাকে কন্ট্রোল করার প্রয়োজন হয় । যেসব ইন্জিনের ফুয়েল ডেলিভারী সিস্টেম কার্বুরেটর সেখানে কার্বরেটর এর নাম ও সংখ্যা দ্বারা স্পেসিফিকেশন দেখানো হয় । আর ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেম , ডিজিটাল ফুয়েল ইনজেকশন , প্রোগ্রামড ফুয়েল ইনজেকশন , ইলেকট্রনিক সিকুয়েশিয়াল পোর্ট ফুয়েল ইনজেকশন প্রভৃতি নামে ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমকে বলা হয়।

কমপ্রেশন রেশিও :

ইন্জিনের কম্প্রেশন রেশিও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । একটা বাইকের ভালব পিষ্টন যখন নীচের দিকে সিলিন্ডারের একদম নিচে থাকে তখন ধরুণ আপনাকে সিলিন্ডাটি পূর্ণ করেত ১০০ সিসি জ্বালানী লাগতে পারে আবার যখন পিষ্টনটি একদম উপরে ওঠানো থাকে তখন আপনাকে সিলিন্ডারটি ফুল করতে ১০ সিসি জ্বালানী লাগতে পারে । এই ১০০: ১০ বা ১০: ১ ই হল বাইকের ইন্জিনের কম্প্রেশন রেশিও । অর্থাৎ পিষ্টনের ২ টা অবস্থানের সময় যে পরিমাণ জ্বালানী সিলিন্ডার ফুল করতে প্রয়োজন হয় সেটাই ইন্জিনের কম্প্রেশন রেশিও । এই কম্প্রে্শন রেশিও যত ভাল হয় , বাইকের পারফরমেন্স ততই ভাল হয় অবশ্য জ্বালানীও একটু বেশী লাগে।

ম্যাক্সিমাম টর্ক :

কোন বাইকের ইন্জিন প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ পরিমাণ ঘূর্ণণের জন্য যে পরিমাণ ঘূর্ণণ শক্তি ইন্জিন থেকে সরবরাহ করতে হয় তাকেই বাইকের ইন্জিনের ম্যাক্সিমাম টর্ক বলে । এটাকে revolutions per minute (RPM) ও বলা হয় । সহজ কথায় বলতে গেলে আপনি বাইকের এক্সেলেরেশনের জন্য থ্রোটল ধরণে বাইকটি যে পরিমাণ এক্সেলেরেট করতে পারে তাকেই বাইকের ম্যাক্সিমাম টর্ক বলা হয়।

ম্যাক্সিমাম পাওয়ার :

কোন বাইকের ইন্জিন দ্বারা কোন নির্দিষ্ট স্পীডে যে পরিমাণ হর্সপাওয়ার সরবরাহ করা হয় তাকেই বাইকের ম্যাক্সিমাম হর্সপাওয়ার বলে । এটা উপর বাইকের পারফরমেন্স অনেকাংশে নির্ভর করে । এটার জন্য একটা সূত্র আছে যেটা হল :

Horsepower = Torque × RPM/5252

অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বাইকের হর্সপাওয়ার বাইকের ম্যাক্সিমাম টর্কের সাথেও জড়িত ।

 আজ এই পর্যন্তই । আবারও কিছুদিন পরে বাইকের অন্য কোন টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে হাজির হব আপনাদের সামনে । সেই পর্যন্ত সবাই ভাল থাকুন ।

 

About শুভ্র সেন

সবাইকে শুভেচ্ছা । আমি শুভ্র,একজন বাইকপ্রেমী । ছোটবেলা থেকেই মোটরসাইকেলের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ রয়েছে । যখন আমি আমার বাড়ির আশেপাশে কোন মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেতাম, আমি তৎক্ষণাৎ মোটরসাইকেলটি দেখার জন্য ছুটে যেতাম ।২ বছর ধরে গবেষণা ও পরিকল্পনার পর আমি এই ব্লগটি তৈরী করি । আমার লক্ষ্য হল বাইক ও বাইক চালানো সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া । সবসময় নিরাপদে বাইক চালান । আপনার বাইক চালানো শুভ হোক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: সকল লেখা সুরক্ষিত !!