মোটরসাইকেল হেলমেট এর যত্নআত্তি

মোটরসাইকেল চালকের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে প্রথমেই চলে আসে হেলমেটের কথা। আসলে মোটরসাইকেলের রাইডিং গিয়ারের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ন গিয়ার হচ্ছে মোটরসাইকেল হেলমেট। আর সেজন্যই বিশ্বের সব জায়গায় মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। যেহেতু হেলমেট সবসময়ই ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাই এর যত্নআত্তিও নিয়মিত করতে হয়। আর তাই আজ আমাদের আজকের আয়োজন মোটরসাইকেল হেলমেট এর যত্নআত্তি। চলুন তবে আমাদের বিশদ আলোচনায়।

মোটরসাইকেল-হেলমেট-এর-যত্নআত্তি

আজকালকার দিনে বাংলাদেশে আমাদের মোটরসাইকেল চালকেরা দিনদিন তাদের নিরপত্তার বিষয়ে বেশ সচেতন হয়ে উঠেছে। আর তাই সেফটি গিয়ার ব্যবহারে সচেতনতাও অনেক বেড়েছে। ফলত: গ্রামাঞ্চলেও হেলমেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা দিনেদিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে যেখানে হয়তো কখনোই তারা হেলমেট ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলনা। আর সেইসাথে ভালো মানের আর ব্র্যান্ডেড হেলমেট ব্যবহারও আনুপাতিকহারে অনেক বেড়েছে।

সুতরাং সবসময় ব্যবহার্য্য এই হেলমেট পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত ভালো অবস্থায় রাখা একটি আবশ্যিক বিষয়। আর আমরা সকলেই জানি যে হেলমেট এমন একটি গিয়ার যা আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গ তথা মাথার আবৃত করে। আর এটা আমাদের চোখ, কান, নাক, মুখ ও মস্তিষ্কের সুরক্ষা প্রদান করে।

সেকারনেই মোটরসাইকেল হেলমেট এর ভেতর বাহির দুদিকেরই যত্ন নিতে হয়। আর তাই আজ আমরা আমাদের আলোচনায় হেলমেটের যত্নে কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয় সেই বিষয়গুলো আলাদাভাবে সাজিয়েছি। আর সেই সাথে কিছু সাধারন ভুল অভ্যাসও চিহ্নিত করে পরামর্শও রয়েছে। চলুন তবে আমাদের আয়োজনে।

motorcycle-helmet-care-tips

মোটরসাইকেল হেলমেট এর যত্নআত্তি – করনীয়

  • মোটরসাইকেল হেলমেট সবসময়ই শুকনো আর অপেক্ষাকৃত উষ্ণ স্থানে রাখুন।
  • হেলমেটের ভিজর কিছুটা তুলে রাখুন যাতে ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারে। এর ফলে হেলমেটের ভেতর বাজে গন্ধ ও লাইনিঙে ফাঙ্গাস পড়তে পারে না।
  • প্রতিবার হেলমেট ব্যবহার করার পর ভিজর আর বাইরের হার্ড-শেল পরিস্কার করে রাখুন।
  • হেলমেট পরিস্কারে স্বাভাবিক পানি আর হালকা শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
  • ময়লা তোলা ও পরিস্কারের পর মোছার জন্যে কেবল ভেজা অথবা ভেজা ধরনের টিস্যু বা পরিস্কার নরম সুতি কাপড় ব্যবহার করুন। টিস্যু বা পরিস্কার নরম কাপড় না পেলে কেবল পানি দিয়ে ভেজা আঙ্গুল দিয়ে হালকা রগড়ে নেয়াই যথেষ্ট।
  • হেলমেটের এয়ার-ফ্লো ভেন্টগুলো নরম রং করা ব্রাশ দিয়ে পরিস্কার করুন। প্রয়োজনে হালকা শক্তির এয়ার ব্লোয়ারও ব্যবহার করতে পারেন।
  • হেলমেট ভিজর আর হার্ডশেলে মাঝের রাবার সিলিংটাও নরম রং করা ব্রাশ দিয়ে পরিস্কার করে নিতে পারেন।
  • হেলমেটের লকিং, ভিজর ল্যাচ, সান-ভিজর আর মডুলার জয়েন্টগুলো নিয়মিত লক্ষ্য করুন। প্রয়োজনে সামান্য তেল দিতে পারেন্ তবে অবশ্যই বাড়তি তেল টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলুন।
  • হেলমেটের সিনথেটিক ও রাবার লাইনিং গুলোতে কোন চিড় বা ফাঁক দেখা গেলে তা রাবার গ্রেড গ্লু দিয়ে সাবধানে নিজেই সারিয়ে নিন।
  • হেলমেট প্রতিনিয়ত ব্যবহারে নোংরা হয়ে গেলে লাইনিং খুলে তা পরিস্কার করে নিন।
  • ইনার লাইনিং পরিস্কারে উষ্ণ শ্যম্পু-পানি ব্যবহার করুন। লাইনিংগুলো খুব বেশি ঘসাঘসি না করে হালকা ভাবে চেপে চেপে পরিস্কার করে নিন।
  • ভেজা লাইনিং রৌদ্রে ভালোভাবে শুকানোর পরেই কেবল তা পুনরায় হেলমেটে সেট করুন।
  • হেলমেটের লাইনিং পরিস্কারের সময় ভেতরের হার্ড-শেলটাও নরম ব্রাশ ও এয়ার ব্লোয়ারের সাহায্যে পরিস্কার করে ফেলুন।
  • যেসব হেলমেটের ভেতরের লাইনিং খোলা যায়না তা সাধারন শ্যাম্পু-পানিতে ধোয়া যায় না। এধরনের হেলমেট পরিস্কারের জন্যে ফোম-বেজড মোটরসাইকেল হেলমেট ক্লিনিং কিট পাওয়া যায়। এধরনের কিট না পেলে হেলমেটের ভেতর দিক ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে সুর্যের দিকে মুখ করে শুকিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় নেই।

how-to-wash-helmet-liner

মোটরসাইকেল হেলমেট এর যত্নআত্তি – বর্জনীয়

অনেকসময় আমরা হয়তো আগ্রহের আতিশয্যে হেলমেটের যত্ন নিতে গিয়ে কিছু ভুল পন্থা অবলম্বন করি এবং ক্ষতিই করে ফেলি। সেজন্যই আমরা কিছু ভুল অভ্যাসের তালিকা করেছি যা সযত্নে পরিহার করা উচিৎ। চলুন ভুলগুলো দেখে নেয়া যাক।

  • মোটরসাইকেল হেলমেট কখনোই সাধারন সাবান দিয়ে পরিস্কার করবেন না। সাবানের তৈলাক্ত কেমিকেল হেলমেট ভিজর আর হার্ড শেলে একটা তৈলাক্ত আস্তরন ফেলে যা ভিজরের স্বচ্ছতা কমায় আর সহজেই ধুলো টেনে নেয়।
  • হেলমেট কখনো খসখসে এমনকি শুকনো টিস্যু দিয়ে পরিস্কার করবেন না। শুকনো টিস্যু ভিজরের উপর পাতলা দাগ ফেলে দিতে পারে যা দিনের আলোতে সমস্যা না করলেও রাতে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির আলোতে ঘোলা দেখায়।
  • ভিজর পরিস্কারের সময় আড়াআড়ি টিস্যু না ঘসে একপাশ থেকে অন্যপাশে টেনে নেয়া ভালো। এত করে ভিজরে সহজে দাগ পড়তে পারে না।
  • হেলমেট পরিস্কারের জন্যে কখনোই নন-ব্র্যান্ড ক্লিনিং কিট ব্যবহার করবেন না। খুব ভালো মানের ব্র্যান্ডেড ও সার্টিফায়েড কিট ব্যবহার করুন, নয়তো হালকা শ্যাম্পু-পানিই যথেষ্ট।
  • ভিজর ও এন্টি-ফগ পিন-লক ভিজর পরিস্কারে কোনভাবেই কোন রকম ক্লিনিং লিকুইড ব্যবহার করবেননা, এতে স্থায়ীভাবে ভিজরের স্বচ্ছতা হারাতে পারে।
  • হেলমেটের লাইনার অথবা ভিজর খোলার সময় কোনভাবেই বাড়তি চাপ দেয়া যাবে না; কেননা তাতে হয়তো লকিং রিভেট আর ল্যাচগুলো হারাতে পারেন।
  • হেলমেট লাইনিং ও অন্যান্য যায়গার চিড় মেরামতে রাবার গ্রেড গ্লু ছাড়া কোনভাবেই ইন্ডাষ্ট্রিয়াল গ্লু ব্যবহার করা যাবে না। কেননা এসব গ্লু অনেক সময়েই হেলমেটের পরিকার্বনেট শেল ও রাবার লাইনিং গলিয়ে ফেলতে পারে।
  • আমরা অনেকেই হেলমেটের কালার মডিফিকেশন করে থাকি। দয়া করে এই কাজটি করবেন না। কালার মডিফিকেশেনে হেলমেটের বাইরের হার্ড শেলের বাইরের লেয়ারটি তুলে বা ঘসে নিতে হয় যেটা মুল লেয়ারটিকে তাপমাত্রা, সূর্য্য-রশ্মি ও অন্যান্য প্রতিকুলতা থেকে রক্ষা করে। এই লেয়ার তুলে বা সরাসরি রং দিলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হেলমেটের আয়ু কমিয়ে দেয়। সুতরাং এটা বর্জনীয়।

helmet-liner-cleaning-washing-procedure

মোটরসাইকেল হেলমেটের যত্নআত্তি – কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

আমাদের দেশের বাইকাররা আসলেই তাদের বাইক নিয়ে অত্যন্ত উৎসাহী। তাই অনেকেই অসচেতনভাবেই কিছু ভুল অভ্যাস রপ্ত করে ফেলি। দেখুনতো আমাদের নিচের তালিকার পরামর্শের মধ্যে আপনার সেরকম কোন অভ্যাস মিলে যায় কিনা যা হয়তো আপনার সাধের হেলমেটটির ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায়।

  • আপনার হেলমেটটি যথেষ্ট যত্নের সাথে ব্যবহার করুন কেননা এটা আপনার মাথার নিররাপত্তা নিশ্চিত করে। এটা মানে রাখুন যে আপনার হেলমেট ঠিক ততটাই মুল্যবান যতটা মুল্য আপনার মাথার।
  • অনেকেই যেনতেন ভাবে হেলমেট রাখেন। ইচ্ছাকৃত অথবা খামখেয়ালীর কারনে কখনো হয়তো হেলমেট হাত থেকে পড়েও যায়। মনে রাখুন আপনার হেলমেটটি যতো দামী বা মানসম্পন্ন হোক না কেন তাতে হয়তো আপনার হাত থেকে পড়ার পর থেকেই চিড় ধরার সূচনাটি ঘটতে পারে।
  • হেলমেট ধরার সময় অনেকেই আমরা এর বেল্ট, লাইনার বা ভিজর ধরে টেনে তুলি। এই বাজে অভ্যাসটি ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের আগেই আপনার হেলমেটটি নষ্ট করে দিতে পারে।
  • আমরা অনেকেই ঘাম-গন্ধ দুর করার জন্যে হেলমেট খুব ঘনঘন লম্বা সময়ের জন্যে কড়া রৌদ্রে দিয়ে থাকি। এই অভ্যাসটি হেলেমেটের আয়ু কমিয়ে দেয়। এটা পরিহার করুন; তার বদেলে হেলমেটেটি বাতাস চলাচলের স্থানে ভিজর তুলে রেখেদিন।
  • মোটরসাইকেল হেলমেট কখনো বন্ধ ক্লোজিটে রাখবেন না। এটা ব্যবহার না করলে খোলা জায়গায় ভিজর তুলে ভেতরে সিলিকা জেল দিয়ে রাখুন।
  • বিশ্বমানের প্রায় সব ব্র্যান্ডগুলোই তাদের হেলমেটে প্রায় পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়ে থাকে। আর এই সময়ের পর হেলমেটের হার্ডশেল, লেয়ারের মধ্যকার জোড়-সন্ধি ও শক্তি হ্রাস পায় ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সুতরাং ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের পর এই হেলমেটগুলো বাতিল করুন।

dirt-bike-in-bangladesh

তো বন্ধুরা, মোটামুটি এই ছিল আমাদের আজকের আয়োজন মোটরসাইকেল হেলমেট এর যত্নআত্তি। আশাকরি আজকের আলোচনাটি আপনার শখের ও প্রয়োজনের দামী হেলমেটটির যত্ন নিতে সহায়ক হবে। আর এ বিষয়ে আপনার কোন পরামর্শ থাকলেও আপনি কমেন্টে আমাদের জানাতে পারেন। জানেনই তো মানুষের শেখার কোন শেষ নেই। যাহোক বন্ধুরা আজ তবে এটুকুই, ধন্যবাদ সবাইকে আমাদের সাথে থাকার জন্যে।

About Saleh Md. Hassan

আমি কোন বাতিকগ্রস্ত পথের খেয়ালী ধরনের নই…. তবে মোটরসাইকেল পছন্দ করি ও প্রয়োজনে ব্যবহার করি মাত্র…. কিছুটা ঘরকুনো বাধ্যগত চালক…. তবে মাঝে মাঝে নিজের ভেতরের যোগী-ভবঘুরে স্বত্তাকে মুক্তি দেই আমার দুইচাকার ঘোড়ার উপর চেপে বসে বিস্তৃত অদেখার পথে ছুটে যাবার জন্য…..অনেকটা বাঁধনহীন চির ভবঘুরের মতো…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: সকল লেখা সুরক্ষিত !!