Suzuki Gixxer এর মালিকানা রিভিউ লিখেছেন তানভীর

সবাইকে শুভেচ্ছা। আমি তানভীর সৈয়দ। আজকে আমার প্রিয় Suzuki Gixxer  নিয়ে ৫০০০ কিঃমি এর মালিকানা রিভিউ লিখতে যাচ্ছি। একইসাথে আমার বাইকিং জীবনের গল্পটাও বলে ফেলবো। আমি Suzuki Gixxer কিনি ২৯ জানুয়ারি ২০১৭তে সোনারগাঁও মটরস থেকে। পূর্বে আমার দাদা ভেসপা চালাতেন। পরবর্তীতে সেটা আমার বাবা পায় এবং চালাতে থাকে। অতঃপর উনি পালসার কেনেন, স্পোক রিম এর প্রথমদিকের ভার্সন টা। বাইকের প্রতি আমার বাবার সবসময় ভালবাসা ছিল কিন্তু বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার শিকার হবার পর বাইক বিক্রির সিধান্ত নেয়। বাইক বিক্রির পর থেকেই আমার উপর বাইক চালাবার নিষেধ সত্ত্বেও চুরি করে গ্রামে আমার ফুপার থেকে বাইক চালানো শিখে ফেলি। কিন্তু তারপরে আর চালানো…

Review Overview

User Rating: 4.63 ( 7 votes)

সবাইকে শুভেচ্ছা। আমি তানভীর সৈয়দ। আজকে আমার প্রিয় Suzuki Gixxer  নিয়ে ৫০০০ কিঃমি এর মালিকানা রিভিউ লিখতে যাচ্ছি। একইসাথে আমার বাইকিং জীবনের গল্পটাও বলে ফেলবো।

suzuki gixxer

আমি Suzuki Gixxer কিনি ২৯ জানুয়ারি ২০১৭তে সোনারগাঁও মটরস থেকে। পূর্বে আমার দাদা ভেসপা চালাতেন। পরবর্তীতে সেটা আমার বাবা পায় এবং চালাতে থাকে। অতঃপর উনি পালসার কেনেন, স্পোক রিম এর প্রথমদিকের ভার্সন টা। বাইকের প্রতি আমার বাবার সবসময় ভালবাসা ছিল কিন্তু বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার শিকার হবার পর বাইক বিক্রির সিধান্ত নেয়।

বাইক বিক্রির পর থেকেই আমার উপর বাইক চালাবার নিষেধ সত্ত্বেও চুরি করে গ্রামে আমার ফুপার থেকে বাইক চালানো শিখে ফেলি। কিন্তু তারপরে আর চালানো হয়নি। কারন মানুষের বাইক চেয়ে চালাতে লজ্জা করতো, তার উপরে নিজের তো বাইক নেই। তারপরেও আমার এক ছোট ভাই তার হাঙ্ক দিয়ে আমাকে রাস্তা ঘাটে বাইক চালাবার জন্য পোক্ত হতে সাহায্য করে।

এভাবেই চলছিল, মাঝে সাঝে খুব ঘনিষ্ট বন্ধুদের বাইক চালাতাম। আর বাসায় প্রায় ১ বছর ধরে কিনার জন্য যুদ্ধ করছিলাম। তখন বলেছিল নিজের টাকা দিয়ে কিনিস, আমরা দিতে পারবো না। সংকল্প করে ফেললাম তখন আর কামাই রোজগার শুরু করার পর মহান আল্লাহ এর ইচ্ছায় মাত্র ৪ মাসে জমিয়ে ফেললাম বাইক কেনার টাকা। কিন্তু এবার বাসায় বিপত্তি। বলে লাগবে না বাইক কিনা। বলে “যেই টাকা জমাইসস, সেটা দিয়া ৫ বছর সিএনজি তে আসতে যাইতে পারবি”।

পরবর্তীতে বাসায় বুঝিয়ে বলে কয়ে রাজি করলাম। বুঝালাম যে আমার তো খারাপ কোন নেশা নেই, খালি একটা বাইক এর নেশা। পরে বাসায় বুঝল আমাকে থামানো সম্ভব না, আর বাবা যেহেতু বাইকার ছিলেন, একটু নরম হলেন। তবে শর্ত দিলেন কেনার ১ বছর এর মাথায় বিক্রি করে দিতে হবে। যাই হোক শর্ত মেনে রাজি হলাম। ভাবলাম পরের টা পরে, আগে কিনে নেই।

Suzuki Gixxer এর লেটেস্ট বিক্রয়মূল্য দেখতে এখানে ক্লিক করুন

suzuki gixxer vs yamaha fzs

এইবার আসি সিলেকশন পর্বে। প্রথমে ভাবি কমটাকায় সেকেন্ড হ্যান্ড হাঙ্ক নিবো। তখন আমার বন্ধু বলে ভাই নিবা তো ভালো জিনিসটা নাও। FZS নাও, পরে আমারে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করতে পারবা না। তখন বাজেট বাড়িয়ে ১৭০০০০ করলাম। কিন্তু ভালো কন্ডিশনের কিছু পেলাম না। তারপর ২০০০০০ পর্যন্ত করলাম। ভাল একটা পেলাম এবং তখন আমার ওই শয়তান বন্ধু আবার বললো “নতুন জিনিস নেও, নতুন বাইকে মজা আলাদা”এবং আরও অনেক টুপি দিল আমাকে। পরে আল্লাহ এর নাম নিয়ে সাহস করে ঠিক করলাম FZS FI নিবো। তখন প্রি-বুকিং চলছে। কিন্তু যেহেতু বাজেট আরও ১ লাখ বাড়বে তাই তখন নিতে পারলাম না।

তার ৩ মাস পর ৩ লাখ টাকা তৈরি। নিজের ঘাম ঝরানো টাকা। বাসা থেকে বের হলাম একাই বাইক নিবো। তকি ট্রেডারস এ যাচ্ছি। রামপুরা নেমে দাড়ালাম আর ফোন এ একজন থেকে খবর আসলো যে জিক্সার নাকি দাম কমিয়ে দিয়েছে বাজেট এর কারনে। এখন ডিলার এর কাছে নাকি ২১৮০০০ টাকা রেজিঃ ছাড়া।

আমি যখন ঠিক করি জিক্সার কে বাদ দিয়ে FI নিবো তখন জিক্সার বাদ দেয়ার কারন ছিল

১. বাইকের নিচে নাকি ঘষা খায় স্পিড ব্রেকার এ।

২. অনেক বেশি টান বাইকে, এত টান দিয়ে কি করবো।

৩. সবাই খালি FZ FZকরতো, বলতো মামা FZS FI টা FZ থেকেও ভালো হইব।

৪. ইয়ামাহা এর উপর আস্থা ছিল তাই কষ্টের টাকা বেশি লাগলেও ইয়ামাহা নিবো।

৫. হাঙ্ক এর পর তখন FZS চালিয়েছি, তারপরে বন্ধুর Fazer Fi চালিয়ে FZ থেকেও ভালো লেগেছিল।

কিন্তু যখন দেখি FZS FI ২৭০০০০ টাকা আর জিক্সার ২১৮০০০ টাকা তখন আর থাকতে পারি নাই। এত বড় গ্যাপ এর কারনে জিক্সার তখন বেস্ট ভ্যালু ফর মানি মনে হলো। তাই বাসায় এসে রাতে বন্ধুকে নিয়ে জিক্সার কিনে ফেলি। কিনার সময় ওর মন খারাপ ছিল। ভাবতেছিলাম যে FI না নিয়ে কি ভুল করলাম নাকি। কিন্তু এখন টের পাচ্ছি যে ভুল তো করি নাই, বরং খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

suzuki gixxer performance

যথারীতি সব ফরমালিটিস শেষ করলাম। বাইক স্টার্ট দিয়ে চালিয়ে দেখি ওরে বাবা, একি!! মনে হয় একটা মাখনের টুকরা ইঞ্জিন এ ছেড়ে দিসে, আর সাউন্ড শুনে মনে হচ্ছে বাঘ গর্জন করতেছে। মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল। আস্তে ধীরে চালিয়ে রাত ১১ টায় বাসায় এসে বাবাকে বাইক দেখালাম।

প্রথম যখন জিক্সার এ উঠি, থ্রটল দেই আর খালি অবাক হই, একটা বাইক এর থ্রটল এত প্রিসাইজ আর স্মুথ আর ইঞ্জিন একদমভাইব্রেশন লেস কিভাবে হয়। আর ব্যালান্স দেখে তো আরও অবাক। যেভাবে নেই যেদিকে নেই যত স্পীড এ নেই না কেন, সেভাবে সেদিকে সেই স্পীড এ জিক্সার পুরা বাধ্য ছেলের মত।

এবার আসুন এই জিক্সার নিয়ে আমার ৫০০০+ কিমি এর অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করি যার মাঝে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে এই রোজার ইদে প্রায় ১২০০ কিলোঃ এর ভ্রমন ছিল।বাকিটা ঢাকাতে। আসলে একটা বাইকের ভালো খারাপ দিক শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্য কমপক্ষে ১০০০০ কিলো চালানো প্রয়োজন। তাই আমার এই ৫০০০ কিলো রিভিউ হচ্ছে ইনিশিয়াল ইম্প্রেশন। ১০০০০ কিলো সম্পন্ন করে একটা কমপ্লিট রিভিউ দিবো ইনশাআল্লাহ। তবে এই অভিজ্ঞতা বলার সময় কিছু ক্ষেত্রে আমি ভালো ভাবে বোঝাবার জন্য FZF FI এর সাথে এই জিক্সার কে তুলনায় আনবো।

Suzuki Gixxer –  ইঞ্জিন পারফর্মেন্স এবং সাউন্ড:

আপনি যখন প্রথম জিক্সার স্টার্ট দিবেন, তখন এর সাউন্ড শুনেই বুঝবেন এটা বেশ পাওয়ারফুল একটি বাইক। নরমাল মিস্টি সাউন্ড (হাঙ্ক, আরটিআর) নয় এটির, বরং বেশ লাউড আর থ্রটি সাউন্ড। আমার মতে ১৫০ সিসি এয়ার কুল্ড সেগমেন্ট এ জিক্সার এর মত সেরা সাউন্ড আর কোন বাইক এর নেই। আর ইঞ্জিন এর কথা কি বলবো। এটাও এই সেগমেন্ট এর সবথেকে বেশি রিফাইন এবং শক্তিশালী। ১০০ কিমি তেও বাইকে কোন ইঞ্জিন ভাইব্রেশন নেই। অবাক করার মত ব্যাপার একদম। কোনদিন টের পাইনি ভাইব্রেশন কি জিনিষ।

আর থ্রটল রেসপন্স এর কথা বলার মত নয়। থ্রটল ঘুরাবেন আর দেখবেন মুহূর্তেই স্পীড ৬০কিমি +। প্রথম প্রথম আমি খালি অবাক হতাম যে ১৫০ সিসির একটা এয়ার কুল্ড বাইক কিভাবে এত দ্রুত স্পীড তোলে? কিভাবে সম্ভব? অনেক পাঞ্চি এর পাওয়ার ডেলিভারি। যখন যেইখান থেকেই, যেই গিয়ার থেকেই থ্রটল ঘুরাবেন, টের পাবেন যে কি হচ্ছে। আমার মতে এই জিক্সার চালাবার পর এর থ্রটল রেসপন্স দেখে আপনি CBR/R15/GSX ছাড়া অন্য কোন বাইকে সন্তুষ্ট হতে পারবেন না। এক কথায় Gixxer has a very well-engineered engine.

যদি FZS FI এর সাথে তুলনা করেন, ফুয়েল ইনজেকশন এর কারনে Fi একটু বেশি রিফাইন কিন্তু যখন রাস্তায় নামবেন, আপনার মনে হবে জিক্সার FI এর মতই রিফাইন। FI এর পাওয়ার ডেলিভারি অনেক লিনিয়ার আর ৮০ কিমি এর পরে FI কে অনেকটা Out of Breath মনে হয় যেখানে জিক্সার কোন কষ্ট ছাড়াই ১০০ তে চলে যায়। তারপরে জিক্সার একটু আস্তে আস্তে স্পীড উঠায়। তবে ২টা বাইকের টপ স্পীড প্রায় সেম কিন্তু Fi প্রায় ২০ সেকেন্ড সময় নেয় টপ তুলতে যেখানে জিক্সার ১৪ সেকেন্ডেই টপ তুলে ফেলে। তবে রিফাইনমেন্ট এর কথা ভাবলে FI সামান্য একটু বেশি রিফাইন ফুয়েল ইনজেকশন এর কারনে।

suzuki gixxer top speed

Suzuki Gixxer – কন্ট্রোল:

একটা বাইকের কন্ট্রোল আপনাকে অনেক বেশি স্পীড ক্যারি করতে কনফিডেন্স দিবে। আর জিক্সার ও এইদিক থেকে সবথেকে এগিয়ে। খুবই পরিকল্পিতভাবে ডিস্ট্রিবিউশন করা ওয়েট এর কারনে ব্যালেন্স আর কন্ট্রোল এক কথায় অতূলনীয়. এর সিটিং এবং হ্যান্ডেল বার এর পজিশন আপনাকে অনেক বেশি স্পীড ক্যারি করতে আর স্পীড এ কর্নার করতে উসকে দিবে।

যদি বোঝাবার জন্য FZS এর সাথে তুলনা করি, তাহলে ২ টা বাইক এর কন্ট্রোল প্রায় সেম যদি হাই স্পীড স্ট্যাবিলিটি আর সিটি তে ফ্লিক্যাবিলিটি এর কথা চিন্তা করেন। তবে এদের কন্ট্রোল এর আচরন কিছুটা ভিন্ন।FZS এ যেখানে ম্যাস সেন্ট্রালাইজ করা কয়েছে ওয়েট কে, সেখানে জিক্সার এর ওয়েট একটু পেছনের দিকে বেশি যেটা ব্যালেন্স এর সাথে দ্রুত গতি তুলতে সহায়তা করে। সামনের দিকটা বেশ হালকা হবার কারনে জ্যাম এ কখনোই কষ্টকর মনে হয় না জিক্সার কে। ২টা বাইকেই চালবার সময় সমান পরিমান কনফিডেন্স পাবেন তবে আমার মতে আপনি FZS এ কিছুটা বেশি কনফিডেন্স পাবেন একটু বেশি ওয়েট হবার কারনে জিক্সার থেকে। আর স্ট্রেট লাইনে FZ একটু বেশি সাবলীল যেখানে জিক্সার এর খেলা দেখবেন কর্নার করার সময়। পয়েন্ট দিলে FZ ১০ পয়েন্ট আর জিক্সার ৯.৫ পয়েন্ট আউট অফ ১০।

Suzuki Gixxer – ব্রেকিং:

সামনে বিশাল সাইজের ডিস্ক এর সাথে ব্রাইব এর পিস্টন ক্যালিপার আর পেছনে ড্রাম নিয়ে যেকোনো অবস্থায় জিক্সার কে থামাতে কোন কষ্ট হয় না। সামনে পেছনে ২টা ডিস্ক হলে তো কথাই নেই। কিন্তু আমার মতে এই ব্রেক আরও ভালো হতে পারতো। সামনের ব্রেক এ কামড় টা নেই আসলে। বাইক থামবে ঠিক ঠাক মত কিন্তু কামড় টা থাকলে ব্রেকিং এর ফিল আরও ভালভাবে পাওয়া যেত। আর সামনের সাসপেনশন অনেক বেশি দেবে যায় হার্ড ব্রেকিং এর সময় যেটা অনেকের কাছে পছন্দ না হতে পারে।

ব্যাপারটা হচ্ছে ওয়েট ডিস্ট্রিবিউশন এর জন্য জিক্সার এর সামনের দিক একদম হালকা, পেছনে একটু বেশি ওয়েট সামনের তুলনায়। তাই ব্রেকিং এর সময় বাইক অনেক বেশি পরিমানে সামনের দিকে নেমে যায় যাতে আপনার শরীরের ভর সামনে চলে আসে যাতে বাইকের ব্যালেন্স পয়েন্ট মাঝখানে থাকে।এতে অনেক হার্ড ব্রেকিং এর সময় ও ওয়েট ডিস্ট্রিবিউশন ঠিক থাকে। প্রথমদিকে অনেকের কাছে এটা একটু আনকমফরটেবললাগতে পারে প্রথম প্রথম। কিন্তু এটাই জিক্সার এর ব্রেকিং এর ক্যারেক্টার। সময়ের সাথে সাথে একসময় আপনি এই ক্যারেক্টারকে এঞ্জয় করতে শুরু করবেন।

তবে বাইকের ব্রেক আরও ভালো করা যেতে পারতো। ব্রেকিং এর সময় স্ট্যাবিলিটি অনেক অনেক ভালো কিন্তু ব্রেক হতে সময় নেয় কিছুটা যদি বাইক হাই স্পীড থেকে দ্রুত থামিয়ে আনতে হয় তখন। তবে ডুয়াল ডিস্ক এর ক্ষেত্রে ব্রেকিং অনেক ভালো এবং ব্রেক করতে যে বেশি সময় নেয় সেই সমস্যাটা অনেকখানি কমে গেছে।

যদি FZS এর সাথে তুলনা করতে হয় তাহলে FZS এ ব্রেকিং এর সময় আপনি অনেক বেশি কনফিডেন্ট থাকবেন। সেম স্পীড থেকে ব্রেকিং করলে জিক্সার থেকে বেশ কিছুটা আগেই FZ FI থামিয়ে ফেলতে পারবেন। ব্রেকিং এ FZS কে ৯ দিলে জিক্সার কে ৭ দিব আমি ১০ এর ভেতরে।

suzuki gixxer review

Suzuki Gixxer – লুক:

লুক ব্যাপারটা আসলে অনেকটা ব্যাক্তিগত। তবে জেনারেল দৃষ্টিতে দেখলে একটা পারফেক্ট স্ট্রিট ফাইটার এর সাইজ। বেশি বড় না, আবার ছোট ও না। ফুয়েল ট্যাঙ্ক এর সাইজ একদম পারফেক্ট আর দেখতে অসাধারন। তবে লম্বা আর মাশাআল্লাহ স্বাস্থ্য যাদের আছে আমার মত, তারা বসলে তাদের নিচে বাইক খুজে পেতে কষ্ট হবে। তবে হালকা পাতলা হলেও যেই দিক থেকেই তাকান না কেন, শুধু তাকিয়ে থাকতেই মন চাইবে।

Suzuki Gixxer – সাসপেনসন, টায়ার এবং রাইডিং কমফোর্ট:

আগেই বলেছি টেকনিক্যাল কোন কথায় যাবো না কারন সবাই সব জানে আর না জানলেও ওয়েবসাইটে টেকনিক্যাল বিস্তারিত দেয়া আছে দেখে নিবেন। সেই কথা মাথায় রেখে বললে জিক্সার এর সাসপেনসন বেশ ভালোই। একটু শক্ত তাই ভাঙ্গা রাস্তায় গেলে ঝাকি টের পাবেন। আরেকটু নরম হতে পারতো। খারাপ হত না আরেকটু নরম করা গেলে। রাইডিং কমফোর্ট অনেকখানি বেড়ে যেত যদি সেটাপ টা আরেকটু নরম হত।

টায়ার এর সাইজ মাশাআল্লাহ। সামনে ১০০/৮০ আর পেছনে ১৪০/৬০। বিশাল সাইজ। আর ভয়াবহ পরিমান গ্রিপ এই টায়ার এ। বৃষ্টির দিনে গ্রিপ সামান্য একটু কমে যায় যেটা খুব কমন, কিন্তু বৃষ্টি ছাড়া এই MRF RevZএ এত গ্রিপ যে এর থেকে বেশি গ্রিপ আর দরকার নেই। আর এই টায়ার এর সাইজ রেডিয়াল, তাই বাইকের মাইলেজ তো ভালো পাওয়া যায় ই যায়, সাথে সাথে বাইকটা নিয়ে অনেক বেশি স্পীড এ কর্নার করা যায় আর কর্নার এর সময় অনেক ভালো গ্রিপ থাকে। নিঃসন্দেহে জিক্সার এর টায়ার এর কারনে জিক্সার কে কর্নার কিং আর মাইলেজ মাস্টার উপাধি দেয়া যায়।

যদি সত্যি কথা বলি তাহলে জিক্সার এর রাইডিং কমফোর্ট তেমন একটা না। খুব বেশি আরাম পাওয়া যায় না লম্বা রাইডে। আর পিলিওন সিট নিয়ে কি বলবো। যদি আপনার কোন বন্ধু বান্ধব আপনার সাথে বেয়াদবি করে থাকে, তাহলে খালি আধা ঘন্টা বাইকের পেছনে বসিয়ে রাখবেন। আর জীবনেও আপনার সাথে বেয়াদবির চিন্তা করবে না।

Suzuki Gixxer – সিটি পারফর্মেন্স এবং সিটিতে মাইলেজ:

সিটি তে এই বাইক চালিয়ে যেই মজা পাবেন টা অন্য কোন বাইকে পাবেন কিনা সন্দেহ। ১৩৫ কেজির বাইক এ বসলে অনেক হালকা লাগে ফলে জ্যাম এ ফাক ফুক দিয়ে আরামসে বের হয়ে যেতে পারবেন। আর ইঞ্জিন এর ভালো পরিমান পাওয়ার এর কারনে ওভারটেকিং ডাল ভাত। পেছনে ১৪০/৬০ যাকে আমরা মোটা চাক্কা বলি, থাকাতে ভাঙ্গা চুরা কাদা মাটি বালু, চনা ইট টের ও পাবেন না। আর গিয়ার রেশিও লং হবার কারনে ঘন ঘন গিয়ার পরিবর্তন করতে হয় না যেটা বেশ কাজের।

ঢাকাতে আমি সর্বনিম্ন ৩১ এবং সবথেকে বেশি পেয়েছি ৩৮ কিমিঃ লিটার এ। ফুয়েল নেই আমি মৎস্য ভবন এর পাম্প, মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল আর নীলক্ষেত এর পাম্প থেকে।

Suzuki Gixxer – হাইওয়ে পারফর্মেন্স এবং হাইওয়ে তে মাইলেজ:

হাইওয়ে তে বাইকের কথা কি বলবো। ১২০ উঠবে আরামসে, আর অভারটেক খালি করবেন আরামসে। তবে নেকেড ভ্যারিএন্ট হবার কারনে Wind Protection নেই তাই গায়ে প্রচুর বাতাস লাগে যেটা লম্বা ভ্রমনে ক্লান্তির কারন হয়ে দাড়াতে পারে। কিন্তু বাইক আবার ঠিক ঠাক মতই এই বাতাস কেটে বেরিয়ে যায়। হবে না কেন? হায়াবুসা যেই টানেল এ পরীক্ষা করা, সেই টানেলেই তো জিক্সার এর জন্ম।

হাইওয়েতে জিক্সার এর মাইলেজ দেখে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ৪৮ কিমিঃ পেয়েছি আমি লিটার এ যখন কক্সবাজার যাই তখন।

ইঞ্জিন ওয়েল:

জিক্সার এ ইঞ্জিন ওয়েল লাগে ৮৫০ এমএল, আর ওয়েল ফিল্টার বদলালে লাগে ৯৫০ এমএল। এইটা একটা যন্ত্রণা। বেশি দিলে বাইক ওভারহিট হয় আর ওয়েল সিল নষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তবে ইঞ্জিন ওয়েল দেবার সময় ইঞ্জিন এ কাচের গোলাকৃতির ইঞ্জিন ওয়েল ইনডিকেটর এর দিকে খেয়াল করে দিলেই হবে।

সুজুকি রিকমেন্ড করে 10w40 যেখানে র‍্যাঙ্কন 20w40 গ্রেড দেবার জন্য বলে। আপনি যেটাই দেন না কেন শুরু থেকে, গ্রেড পরিবর্তন না করে যেটা খুশি সেটা দিন। কোন সমস্যা নেই। আমি র‍্যানকন থেকে সুজুকির রিকমেন্ডেশন এর উপরে ভরসা বেশি রাখি তাই আমি সবসময় 10w40 গ্রেড ব্যাবহার করি।

10w40 গ্রেড এর রিকমেন্ডেড মিনারেল ইঞ্জিন ওয়েল লিস্ট:

  1. Suzuki by Motul 10w40

সিনথেটিক ব্লেন্ড এর জন্য রিকমেন্ডেড হচ্ছে:

  1. Motul 7100 10w40
  2. Shell Advance Ultra 10w40
  3. Mobil 1 Racing 4T 10w40

20w40 গ্রেড এর জন্য মিনারেল/সেমি সিনথেটিক ব্লেন্ড রিকমেন্ডেড হচ্ছে:

  1. Motul 3000 20w40
  2. Shell Advance 20w40
  3. Havoline Super 4T20w40
  4. Castrol Activ 4T 20w40

আমি প্রথম ৩০০ কিলো তে একবার ওয়েল এবং ওয়েল ফিল্টার, ৮০০ কিলো তে আবার ওয়েল, ওয়েল ফিল্টার, ১৫০০ কিলো তে ওয়েল এবং ওয়েল ফিল্টার পরিবর্তন করি। তখন আমি Suzuki by Motul 10w40 ব্যাবহার করতাম এবং ২২০০ কিলো তে Motul 7100 10w40 সিনথেটিক এ সুইচ করি। সিনথেটিক এ প্রতিবার ওয়েল বদলাবার সময় ওয়েল ফিল্টার আর মিনারেল এ প্রতি ২ বার এ ১ বার ওয়েল ফিল্টার বদলাবার জন্য রিকমেন্ড করছি আমি।

suzuki gixxer price in bangladesh

কেন আপনি Suzuki Gixxer কিনবেন?

১. ১৫০ সিসি এয়ার কুল্ড সেগমেন্ট এর সবথেকে শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং ভাইব্রেশন লেস ইঞ্জিন।

২. অসাধারন কন্ট্রোল এবং ব্রেকিং।

৩. হাই রিসেল ভ্যালু।

৪. অনেক ইনফরমেশন সমৃদ্ধ স্পীডমিটার।

৫. হাতের নাগালের মাঝেই দাম।

৬. ভ্যালু ফর মানি অনেক অনেক বেশি জিক্সার এ।

আমার কাছে জিক্সার এর ইঞ্জিন এর পারফর্মেন্স আর স্মুথনেস অনেক ভালো লাগে। এর কন্ট্রোল তো অসাধারন আমার মতে। আর সবথেকে ভালো লাগে যে রোদ ঝড় বৃষ্টি তে আল্লাহ এর রহমতে কোন অসুবিধায় ফেলেনি আমাকে। আর মাইলেজ অসাধারন হবার কারনে অল্প খরচেই অনেক বেশি ভ্রমন করা যায়।

কেন আপনার Suzuki Gixxer নেয়া উচিত নয়ঃ

১. খুব বেশি কমন হয়ে গেছে এখন জিক্সার, সবার ঘরে ঘরে।

২. খুব নিম্নমানের সুইচ।

৩. দুর্বল বডি প্লাস্টিক আর পেইন্ট এর মান ও অনেক দুর্বল।

৪. রাইডিং কমফোর্ট বেশ কম এবং খুব ছোট আর অকার্যকর পিলিওন সিট।

৫. চোখের দেখাতে বেশ ছোটখাটো একটা বাইক।

আমার কাছে এই বাইকের সুইচ বাংলাদেশের সবথেকে বাজে সুইচ মনে হয়। সস্তা প্লাস্টিক এর কারনে সুইচ মাঝে মাঝে আটকে যায়। পেইন্ট এর মান আরও ভালো হতে পারতো। অনেক যত্নে চালাই তারপরেও মাঝে মাঝে দাগ পরে যায়। আর বেশি বৃষ্টিতে চলাচল করলে আস্তে আস্তে ফ্রেম এ হালকা মরিচা পরে। তাই বৃষ্টি থেকে আসার শুকনো কাপড় দিয়ে বাইক মুছে ফেলতে পারলে এই সমস্যা হয় না।

Suzuki Gixxer –  কিছু টিপস:

বাইক মানুষ বানায়, তাই বাইকে সমস্যা থাকবেই। তাই সমস্যা মেনে নিয়েই বাইক চালাতে হয়। তবে জিক্সার এর যেই সমস্যাগুলো আছে সেইগুলা সহজেই সমাধান সম্ভব। সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাবার জন্য আমার রিকমেন্ডেশন হবে

১. প্রথমেই সুইচ বদলে FZS FI এর টা, অথবা FZS v1 এর টা লাগানোর জন্য।

২. স্টক হেডলাইট বদলে MOTOLED অথবা OSRAM/Phillips এর হ্যালোজেন বাল্ব লাগাতে পারেন।

৩. হর্ন এর দুর্বলতা ঠিক করতে পালসার এর P70 জোড়া হর্ন লাগাতে পারেন।

৪. পেইন্ট এর মান ধরে রাখার জন্য সপ্তাহে ১ বারের বেশি বাইক ধোবার দরকার নেই।

৫. প্রতিবার বাইক ধোবার পর পলিশ করতে অবশই ভুলবেন না। প্রতিবার না পারলেও মাসে কমপক্ষে ১ বার পলিশ করবেন।

৬. বছরে ১ বার টেফলন এর কোটিং করতে পারলে বেশ ভালো হবে।

৭. দীর্ঘ সময়ের জন্য রোদের মাঝে বাইক পারকিং না করলে পেইন্ট এর মান অনেকদিন ভালো থাকে।

৮. বৃষ্টিতে যারা ঘন ঘন রাইড দেন তারা মাঝে মাঝে বাইকটাকে তেল ওয়াশ করলে খুব ভালো ফলাফল পাবেন।

উপসংহার

দামের সাথে ভ্যালু এর সমন্বয় করলে Suzuki Gixxer নিঃসন্দেহে সেরা একটি বাইক যাকে হারিয়ে দেবার মত বাজারে আর কোন বাইক এই মুহূর্তে নেই। সিটি তে রাজার মত রোমিং করে বেড়াবেন আর মাঝেমাঝে হাইওেয়েতেও দাপিয়ে বেড়াতে পারবেন এই জিক্সার নিয়ে। লুক, পাওয়ার, মাইলেজ, কন্ট্রোল আবার দামও আপনার হাতের নাগালের মাঝেই। আর কি আশা করা যেতে পারে একটা বাইক এর কাছ থেকে? জিক্সার হচ্ছে ওভারঅল একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। যদি গতির সাথে নিখুত কন্ট্রোল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতে চান, তাহলে আমি Suzuki Gixxer নেবার জন্য আপনাকে হাইলি রিকমেন্ড করবো।

বিঃদ্রঃএই সম্পূর্ণ রিভিউটি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা আর আমার পয়েন্ট অফ ভিঊ থেকে লেখা। যদি এই রিভিউ এর কোন ব্যপারে আমার মতের সাথে একমত হতে না পারেন তাহলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সর্বদা হেলমেট পড়ে বাইক চালাবেন ও সর্বদা সাবধানে বাইক রাইড করবেন।

লেখকঃ তানভীর  সৈয়দ 

About আহমেদ স্বজন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: সকল লেখা সুরক্ষিত !!